
মোঃ ইশারাত আলী, কালিগঞ্জ থেকে :
সকাল থেকে রাত-কালিগঞ্জে এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ। আধুনিক জীবনযাত্রা, পেশাগত দক্ষতা আর ব্যবসায়িক লেনদেনের চাকা যখন ইন্টারনেটের গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলছে, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত এক বছরে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এলাকার ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের অবস্থা এখন সবচেয়ে শোচনীয়। পেশাদার গ্রাফিক ডিজাইনার রহিম আহমেদ বলেন, "গত সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের মাঝপথে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। ইউপিএস ব্যাকআপ দেওয়ার আগেই পিসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফাইলটি করাপ্ট হয়ে যায়। ক্লায়েন্টকে প্রজেক্ট জমা দিতে না পারায় আমার দীর্ঘদিনের কাজের সুযোগ হাতছাড়া হলো। এখন ভয়ে কাজ করতে বসলে মনে হয়, এই বুঝি বিদ্যুৎ চলে গেল!"
অফলাইন ব্যবসায়িক প্রতিকূলতা নিয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তা আসিফজানান, "অনলাইন ডেলিভারির জন্য সারাদিন পিসি ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসের যে লুকোচুরি, তাতে ব্যবসার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিদ্যুৎহীনতায় ইন্টারনেটের মডেমগুলোও কাজ করে না, যা আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।"
হঠাৎ বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার ফলে কালিগঞ্জের অনেক কর্মজীবীর কম্পিউটার হার্ডওয়্যার স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আইটি বিশেষজ্ঞ মো: ফয়সাল বলেন, "এলাকার অনেক তরুণ আমাকে পিসি নিয়ে আসেন। বেশিরভাগেরই অভিযোগ, ভোল্টেজ ফ্ল্যাকচুয়েশনের কারণে তাদের পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট (PSU) পুড়ে গেছে অথবা এসএসডি ডেটা করাপ্ট হয়ে গেছে। বারবার এরকম শাটডাউনের ফলে সিস্টেমের সফটওয়্যার ফাইলগুলোও ক্র্যাশ করছে। এটি আসলে এক প্রকারের প্রযুক্তিগত নীরব ধ্বংসযজ্ঞ।"
প্রযুক্তিগত এই অনিশ্চয়তা কালিগঞ্জের কর্মজীবী মানুষের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছেন, অনিশ্চিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তাদের পড়াশোনা এবং অনলাইন ক্লাসের শিডিউল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে কাজ করার ফলে চোখের সমস্যা ও ঘাড়ের ব্যথায় ভোগা মানুষের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন-বিদ্যুৎ বিভাগের দায়বদ্ধতা নিয়ে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যদি নিয়মিত ও পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন হতো না। অধিকাংশ সময় ‘মেরামতের’ নামে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হলেও কার্যত সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
এখন জনমনে জোর প্রশ্ন উঠেছে-এই তথাকথিত মেরামতের নামে কাদের পকেট ভারী হচ্ছে? বিদ্যুৎ কেবল একটি সেবা নয়, এটি বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কালিগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও পেশাজীবীরা এখন দ্রুত এই অরাজক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের স্বচ্ছ জবাবদিহিতা দাবি করছেন।