মোঃ ইশারাত আলী :
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মূল ভিত্তিই হলো "কারবালার চেতনা", যা শিক্ষা দেয় যে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে প্রয়োজনে শাহাদাত বরণ করা শ্রেয়। ইমাম হুসাইনের (রা.) সেই বিখ্যাত নীতি-"হায়হাত মিনাজ জিল্লাত" (লাঞ্ছনা ও অপমান আমাদের থেকে দূরে)-ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
ইরান যদি ট্রাম্পের সমস্ত শর্ত মেনে নেয়, তবে কট্টরপন্থীদের কাছে সেটি "কারবালার আদর্শ" পরিপন্থী মনে হতে পারে। তবে ইরানের ইতিহাসে "ইমাম হাসানের (রা.) সন্ধি" এবং "বিষপান" (রুহুল্লাহ খোমেনী ইরাক-ইরান যুদ্ধ থামানোর সময় এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন) এর উদাহরণও রয়েছে। তারা যদি এমন কোনো চুক্তিতে পৌঁছায় যা তাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে না কিন্তু জনগণের কষ্ট লাঘব করে, তবে তারা একে "কৌশলগত নমনীয়তা" (Heroic Flexibility) হিসেবে ব্যাখ্যা করবে।
যদি ট্রাম্পের শর্তাবলী ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি বা সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার মতো হয়, তবে কারবালার আদর্শ অনুযায়ী ইরান সম্ভবত কোনো চুক্তিতে না গিয়ে তারা সরাসরি যুদ্ধের পথ বেছে নেবে। তাদের কাছে "সম্মানজনক মৃত্যু" "অপমানজনক জীবনের" চেয়ে বড়।
তখন তারা বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি চরম অর্থনৈতিক চাপে ফেলার চেষ্টা করবে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ফ্রন্টগুলোকেও (লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক) সক্রিয় করে দেবে।
কিন্তু পাকিস্তান যদি ইউরেনিয়াম জমা রাখার প্রস্তাব দেয়, তবে ইরান একে এভাবে তুলে ধরতে পারে যে-তারা পারমাণবিক সক্ষমতা "ত্যাগ" করেনি বরং একটি মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের কাছে "আমানত" রেখেছে। এতে তাদের ধর্মীয় ও আদর্শিক ভাবমূর্তি বজায় থাকে, আবার অবরোধ থেকেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়।
অন্যদিকে যদি ইরানি নেতৃত্ব আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কোনো "দুর্বল" চুক্তি করে, তবে ইরানের ভেতরে ইসলামী বিপ্লব পন্থী এবং আইআরজিসি (IRGC) এর মধ্যে বড় ধরণের ফাটল ধরতে পারে। এটি বিপ্লবের অভ্যন্তরীণ ভিতকে দুর্বল করে দিতে পারে, যা তেহরান কখনোই চাইবে না।
আবার আগামীকাল বুধবার যদি যুদ্ধবিরতি নবায়ন না হয় এবং ট্রাম্প যদি সত্যি হামলা শুরু করেন, তবে ইরান সম্ভবত তাদের সেই "নতুন কার্ড" প্রদর্শন করবে। তাদের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ ড্রোন ও মিসাইল মজুদ ব্যবহার করে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, যাকে তারা "প্রতিরোধের যুদ্ধ" হিসেবে আখ্যা দেবে।
তবে এভাবে বলা যায় ইরান বর্তমানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করছে। তারা একদিকে ইমাম হুসাইনের (রা.) আপোষহীন আদর্শকে সমুন্নত রাখতে চায়, আবার অন্যদিকে ইমাম হাসানের (রা.) রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ব্যবহার করে টিকে থাকতে চায়। যদি ট্রাম্পের চাপ তাদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলে, তবে আদর্শিক কারণেই ইরান সম্ভবত 'পিছু হটা'র চেয়ে 'সম্মুখ সমর' বেছে নেবে। তানাহলে তাদের আদর্শিক মতবাদের মৃত্যু হবে।