মোঃ ইশারাত আলী :
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ গড়াতে পারে-এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা। ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসনের ধারণা, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নয়; তাদের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সামাল দেওয়ার মতো শক্তিশালী।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, একই বাস্তবতা ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। গাজায় দীর্ঘ অভিযান, লেবানন ও সিরিয়ায় ধারাবাহিক হামলা এবং ইরানের সঙ্গে আগের সংঘাতের চাপ মিলিয়ে দেশটি সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্লান্ত। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর মূল্য আরও ভারী হয়ে উঠতে পারে।
শনিবার ইরানে হামলার পর থেকেই ইসরায়েল নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে। দেশজুড়ে সতর্কতা সাইরেন বেজে উঠছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে এবং লাখ লাখ রিজার্ভ সেনাকে ডেকে নেওয়া হয়েছে। হাইফা ও তেল আবিবসহ বড় শহরগুলো ধারাবাহিক হামলার শিকার।
জরুরি সেবা ব্যবস্থার ওপরও চাপ স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে আক্রমণ পরিচালনায় অভ্যস্ত ইসরায়েলি সমাজ এবার নিজ ভূখণ্ডে একই মাত্রার যুদ্ধের বাস্তবতার মুখোমুখি। সাধারণ মানুষকে বারবার আশ্রয়কেন্দ্র ও বাঙ্কারে ছুটতে হচ্ছে। তবে আপাতত দেশটির ভেতরে যুদ্ধপন্থী মনোভাবই বেশি দৃশ্যমান।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভারের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর দেশজুড়ে সামরিকতাবাদী আবেগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এটি জুন ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো নয়; তখন জনগণের মধ্যে ধ্বংসের আশঙ্কা প্রবল ছিল, কিন্তু এখন আত্মবিশ্বাস ও সামরিক উচ্ছ্বাস বেশি।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সমর্থন ইসরায়েলি সমাজে ক্রমবর্ধমান উগ্র রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন। আগে প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত অতিডানপন্থি রাজনীতিকরা এখন সরকারের কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অর্থনৈতিক চাপ তরুণদের দেশত্যাগের প্রবণতাও বাড়াচ্ছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যানিয়েল বার-তাল পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ‘ব্লিটজ’ অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতে, তখন ব্রিটিশরা নিজেদের চূড়ান্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে বলে বিশ্বাস করত এবং বোমাবর্ষণ সহ্য করেছিল। ইসরায়েলি সমাজেও এখন অনুরূপ মানসিকতা কাজ করছে। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে ইরানকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর ‘তলোয়ার হাতে বাঁচতে হবে’ বক্তব্যও সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ধারণার সঙ্গে স্থায়ী শত্রু ধারণা গভীরভাবে জড়িত।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজা আত্তার আল-জাজিরা-কে জানান, ইরানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কতদিন চালানো সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে দুই বিষয়ের ওপর-যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তা এবং কার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনেই ইরান ইসরায়েলের দিকে ২০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তুলনায় ১২ দিনের যুদ্ধে মোট প্রায় ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইসরায়েলকে একটি করে প্রতিরক্ষা রকেট ব্যবহার করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল।
ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিন স্তরের-স্বল্পপাল্লার রকেট প্রতিরোধে আয়রন ডোম, মাঝারি পাল্লার হুমকির জন্য ডেভিড এসলিংক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে এ্যারো ৩ ব্যবহৃত হয়।
তবে ইন্টারসেপ্টর মজুতের প্রকৃত সংখ্যা কখনো প্রকাশ করা হয় না। আগের সংঘাতেই সংকটের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। দীর্ঘ যুদ্ধ হলে সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যবহার সীমিত করতে হতে পারে, যা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াবে।
প্রায় দুই বছরের ধারাবাহিক যুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে গাজা ও লেবানন সংঘাতে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবে তা বেড়ে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতি তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক চাপে ২০২৪ সালে বিশ্বের তিন প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম ঋণমান কমিয়ে দেয়। শির হেভারের মতে, দেশটি এখন ঋণ, জ্বালানি, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবা সংকটসহ একাধিক চাপের মুখে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের স্থায়িত্ব নির্ধারিত হবে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয়; বরং সমাজের সহনশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের ভারসাম্যের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র যদি উন্নত অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখে, তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।