মোঃ ইশারাত আলী :
আদালতের সুনির্দিষ্ট রায় এবং পুলিশের জারি করা ১৪৫ ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের সোতা মৌজায় দীর্ঘ ২১ বছর ধরে দখলে থাকা আটটি ভূমিহীন পরিবারকে অবশেষে উচ্ছেদ করেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। গত ১২ মে (২০২৬) পর্যন্ত জমিটি ভূমিহীনদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, গত সোমবার (২৫ মে) গভীর রাতে লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে ঘরের পর ঘর গুঁড়িয়ে ও মাছ লুট করে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। আইন অমান্য করে এই দুর্ধর্ষ হামলার সময় থানাকে দফায় দফায় জানানো হলেও ঘটনার ৫ ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা এখন চরম প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সোতা মৌজার খাস খতিয়ানের ৭.৬৬ একর জমি ২০০৫ সাল থেকে সরকারের কাছ থেকে ডিসিআর (বন্দোবস্ত) নিয়ে ভোগদখল করে আসছিলেন মোঃ ইউনুস আলী মোড়লসহ আটটি ভূমিহীন পরিবার। তাদের উচ্ছেদ করতে প্রভাবশালী শাহনুর মোল্যা গং আদালতে দেওয়ানি মামলা (নং-১০৫/২৫) করলে গত ১২ এপ্রিল আদালত তাদের নিষেধাজ্ঞা ‘ভ্যাকেট’ (বাতিল) করে ভূমিহীনদের পক্ষে রায় দেন।
এরপর গত ১৭ মে ভূমিহীনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কালিগঞ্জ থানা পুলিশ নিজেই ওই জমিতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ১৪৫ ধারা জারি করে (পি মামলা নং-৬৩৮/২৬)। কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞা বাতিল এবং পুলিশের নিজস্ব ১৪৫ ধারা জারির মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় ২৫ মে রাতে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন— পুলিশ প্রশাসন থাকতে কীভাবে আদালতের আদেশ এভাবে পদদলিত করা হলো?
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার গভীর রাতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্টু এবং নব্য জামায়াতের তালিকাভুক্ত ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী শানু মোল্লার নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনী সোতা মৌজার ঘেরে হামলা চালায়। রাজনৈতিকভাবে বিপরীত মেরুর এই দুই নেতার অনুসারীরা একজোট হয়ে ভূমিহীনদের ঘের সংলগ্ন বসতঘর ও স্থাপনা ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর প্রকাশ্য দিবালোকে জাল টেনে ঘের ও পুকুরের কোটি টাকার মাছ লুট করে নিয়ে যায়। ঘরবাড়ি হারিয়ে বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ভূমিহীনরা।
ভুক্তভোগী ইউনুস আলী মোড়ল, গোলাম বারী মোড়ল ও কবির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
"হামলা ও মাছ লুটের শুরুতেই আমরা কালিগঞ্জ থানায় অবিরাম যোগাযোগ করেছি। আমাদের ঘর ভাঙা হচ্ছিল, মাছ লুট হচ্ছিল- অথচ থানা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের পথ পার হতে পুলিশের সময় লেগেছে দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা! পুলিশ যখন পৌঁছায়, ততক্ষণে আমাদের উচ্ছেদ করে ঘেরের সব মাছ লুটে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। ওসি সাহেব কার স্বার্থে পুলিশ পাঠাতে ৫ ঘণ্টা দেরি করলেন, তা এখন পরিষ্কার।"
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যেখানে পুলিশের ১৪৫ ধারা বলবৎ রয়েছে, সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে ৫ ঘণ্টা ধরে তান্ডব চালানো এবং পুলিশের এই রহস্যজনক ‘বিলম্বিত উপস্থিতি’ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ওসির এই নির্লিপ্ততা মূলত প্রভাবশালী ভূমিগ্রাসীদের পরোক্ষ সুবিধা করে দিয়েছে।
১২ মে পর্যন্ত যে জমিটি ভূমিহীনদের শান্তিময় উপার্জনের উৎস ছিল, ২৫ মে তা এখন ধ্বংসস্তূপ। এই নগ্ন উচ্ছেদের পর এলাকায় তীব্র আইন-শৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অসহায় পরিবারগুলো তাদের জমি পুনরুদ্ধার, জানমালের নিরাপত্তা এবং ঘটনার পেছনে থাকা প্রভাবশালী চক্র ও পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।