18 November 2017 , Saturday
Bangla Font Download
সর্বশেষ খবর »

You Are Here: Home » কলাম » গোপালপুরে বাংলার শিকড় সন্ধ্যানী গোবিন্দদেব মন্দির

orbindu
অরবিন্দ মৃধা

ভূমিকা : বাংলাদেশে মধ্যযুগের ঐতিহাসিক নিদর্শনের স্থাপনা যে কয়টি আছে তার মধ্যে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে অবস্থিত গোবিন্দদেব মন্দির অন্যতম। এখানে সমচতুষ্কোন আকৃতি ও ব্যবধানে চারটি মন্দির এবং পশ্চিম পার্শ্বে একই সমান্তরালে আরো দুটি মন্দির বা ইমারত ছিল। এগুলির মধ্যে পূর্ব পার্শ্বের স্থাপনাটি আজও মধ্যযুগের গোবিন্দদেব মন্দিরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, বাঁকিগুলি আনুমানিক দুই শতাধিক বছর পূর্বে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেঙ্গে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে আছে, তবে এই স্তুপগুলির মধ্যে লুকিয়ে আছে অপরূপ কারুকার্য খচিত নকশা ইটের সমচতুষ্কোন আকৃতির দেয়াল, ভিত, দরজা, জানালা সহ মন্দির ইমারাতের অবয়ব।
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক অধ্যাপক শ্রী সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর খুলনার ইতিহাস থেকে জানা গেছে, মধ্যযুগে ভুঁইরা রাজা প্রতাপাদিত্য এবং তাঁর কাকা সু-পন্ডিত বসন্ত রায়ের তত্ত্বাবধানে ১৫৯২ -৯৩ খৃষ্টাব্দ নাগাদ এই মন্দিরগুলি গোপালপুরে নির্মিত হয়েছিল। মিত্র মহাশয় আজ থেকে শতাধিক বছর পূর্বে এই মন্দিরের ইতিহাস লেখার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ ও পরিদর্শন কালে পুর্বপার্শ্বের বড় মন্দিরটির বর্তমান অবস্থা অপেক্ষা অনেকটা ভাল অবস্থায় দেখেছিলেন, তিনি এটিকে দ্বিতল বিশিষ্ট মন্দির হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং তখন ওটির গায়ে নকশা ইটের নিদর্শন ছিল,তবে তার গায়ে বড় বড় গাছ গজিয়ে ঝোপ জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। ‘দন্ডায়মান মন্দিরটি ১৬’-৬র্ ১র্৬Ñর্র্৬র্ ইঞ্চি, ভিত্তি-র্৮Ñর্৯র্ , দরজার খিলান র্৬Ñর্৭র্ ৫ ফুট। পশ্চিমদিকে সদর দুয়ার, দক্ষিণও পূর্ব দিকেও দরজা আছে মন্দিরের গায়ে দেব-দেবীর মুর্তি ও কারুকার্য্যরে পরিচয় এখনও আছে।’ (তথ্যসূত্র: যশোহর -খুলনার ইতিহাস, ২য় খন্ড পৃষ্টা-১৬৪ রূপান্তর প্রকাশনী, খুলনা)।

মন্দিরের অবস্থা :
গোপালপুরে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী গোবিন্দদেব মন্দির, চত্ত্বরে স্তুপ আকারে পড়ে থাকা অন্যান্য মন্দিরগুলি সম্পর্কে অতীতে কারো সুস্পষ্ট কোন ধারণা ছিল না। ২০০৭ খৃঃ উত্তর পার্শ্বের একটি বড় স্তুপ এবং উত্তর-পশ্চিম কোনের একটি ছোট ইট মাটির স্তুপ অপসারণ কালে এ গুলির মধ্যে কারুকার্য খচিত সম-চতুষ্কোনী ইমারতের দেয়াল, ভিত, দরজা, জানালা, বারান্দার দন্ডায়মান কাঠামো দেখে বুঝা গেছে, স্তুপগুলির মধ্যে প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শনী মন্দির রয়েছে। ঝোপঝাড় কেটে ভগ্ন ইট-মাটি-অপসারণ কালে উত্তর পাশের মন্দিরের পরিমাপ নিয়ে দেখা গেছে এটি ছিল ৫৬ বর্গফুট বিশিষ্ট (ভিত ও বারান্দাসহ) চতুষ্কোনী একটি মন্দির। তৎকালীন টেরাকোটা ইটের চুন সুরকি গাঁথনির কারুকার্য খচিত মন্দির। ইটের গায়ে ফুল, ফল, হরিণ, দেব-দেবীর মুর্তি ছিল। পশ্চিম পার্শ্বের (কোনে) ছোট স্তুপটি থেকেও কারুকার্য খচিত ইট বেরিয়েছিল। তবে এটি আয়তনে ছোট ছিল। (তথ্যসূত্র: ঐতিহাসিক মন্দিরদর্পন ও পূজো পরিক্রমণ-পৃষ্টা-১৮, অরবিন্দ মৃধা)।

বিলুপ্ত মন্দিরের কাঠামো : ২০০৭ খ্রিঃ উত্তর পার্শ্বের স্তুপটির ইট মাটি অপসারণ কালে মন্দিরের মুল কাঠামো আবিস্কৃত হওয়ার পর ভেঙ্গে ফেলা হয়। তখন পরিমাপ করে দেখা গিয়েছিল; সমচতুষ্কোণ বিশিষ্ট মন্দিরটির ভিত ৫র্৬Ñর্র্০র্ করে লম্বা অর্থাৎ চার পার্শ্বে বর্গকারে নির্মিত, এটি ছিল ২ স্তরের দেয়াল বিশিষ্ট। বাইরের বারান্দা গুলির দৈর্ঘ্য ৫র্৬Ñর্০র্ প্রস্থ র্৪Ñ র্০র্ । বাইরের দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৪র্৮Ñর্০র্ প্রস্থ র্৩Ñর্৬র্ । মূল মন্দিরের দেয়াল ও বাইরের দেয়ালের মাঝখানের চত্ত্বর র্৮Ñর্০র্ করে চওড়া। মূল মন্দিরের দেয়াল লম্বা ২র্৬Ñ র্০র্ এবং চওড়া র্৪Ñ র্৬র্ । মন্দিরের ভিতরের চত্ত্বর ১র্৭Ñর্০র্ । মন্দিরে প্রবেশের জন্য বাইরের দেয়ালের চার পার্শ্বে দুটি করে মোট আটটি দরজা ছিল, যার প্রত্যেকটির উচ্চতা র্৭Ñর্০র্ এবং চওড়া র্৩Ñর্০র্ করে। মূল মন্দিরে প্রবেশের জন্য পূর্বে পশ্চিম এবং দক্ষিণ পার্শ্বে ঠিক মাঝখান বরাবর তিনটি দরজা যার উচ্চতা র্৭Ñর্০র্ চওড়া র্৩ Ñর্৪র্ । উত্তর পার্শ্বে ছিল বিগ্রহ রাখার স্থান, দু’পার্শ্বে কুতলী ছিল। পশ্চিম উত্তর কোণের স্তুপটির কাঠামো বের না করে একেবারেই ভেঙ্গে ফেলা হয়, যে কারণে ওটির মাপ নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এই ভাবে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল বাঙালির শিকড় সন্ধানী উৎসের দুটি অবয়ব। এ তথ্য থেকে প্রমাণ মেলে যে, গোপালপুরে অবস্থিত রাধাগোবিন্দ মন্দিরের (বর্তমান নাম) পূর্ব পার্শ্বের ভগ্ন মন্দির ছাড়াও দক্ষিণ পার্শ্ব; পশ্চিম পার্শ্ব এবং পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে বর্তমানে দন্ডায়মান স্তুপ তিনটির মধ্যে কারুকার্য খচিত সম-চতুষ্কোন বিশিষ্ট মধ্যযুগীয় নির্মাণ শৈলীর দর্শনীয় মন্দির কাঠামো বিদ্যমান।

মন্দিরের সম্পত্তি :
রাজা প্রতাপদ্যিত্যের পিতা বিক্রমাদিত্য কর্তৃক তৎকালীন যশোহর রাজ্য বিভাজন করে পূর্বাংশ প্রতাপদিত্য এবং পশ্চিমাংশ বসন্ত রায়ের অংশে দেয়া হয়েছিল। গোপালপুর গোবিন্দদেব মন্দিরগুলিও যমুনার পশ্চিমধারে অবস্থিত। রাজা বসন্ত রায়কে হত্যার পর তাঁর পুত্র চাঁদরায়ের রাজত্বকালে এখন থেকে ৪০৫ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৬০৯ খ্রীঃ, বাংলা ১০১৬ সালের ২১ চৈত্র গোবিন্দ দেবের সেবা ও মন্দির রক্ষণাবেক্ষনার্থে বিগ্রহের সেবাইত বল্লভাচার্য্যরে পুত্র শ্রীযুক্ত রাঘবেন্দ্র্র অধিকারী ও শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্র অধিকারীর নামে চাকলা ধুলিয়াপুর পরগনার গোপালপুর, অনন্তপুর, ভুরুলিয়া, হাসনকাটি, কাছিমপুর, মদনার মধ্যচর সহ তেরটি গ্রাম থেকে দুইশত ছেয়াছি বিঘা জমি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেবত্তর হিসেবে প্রদান করেন। (সূত্র: যশোহর-খুলনার ইতিহাস ২য় খন্ড; পৃষ্ঠা-১৬৫)। এসকল সম্পত্তি পরবর্তীকালের বসতি স্থাপনকারী নানা মানুষের নামে সি,এস/এস.এ জরিপকালে বা তারও পরবর্র্তীতে বিভিন্ন ভাবে রেকর্ড হয়ে গেছে, তবে মন্দির চত্ত্বর অর্থাৎ গোপালপুর মৌজার সি,এস ১২০ নং খতিয়ানে ১৯৬ দাগে ২.০৫ একর জমি বিপিন ঘোষের নামে রেকর্ড হওয়ায় খতিয়ানের মন্তব্য কলামে ‘গোবিন্দ দেবের মন্দির’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সূত্রে ২০০৬ খ্রিঃ তাঁদের উত্তরসূরীগণ উক্ত সম্পত্তি গোবিন্দদেব মন্দিরের নামে নিঃশর্তভাবে লিখে দিয়েছেন।

গোবিন্দদেবের কীর্ত্তি : গোপালপুরের গোবিন্দদেব বা রাধা গোবিন্দ খুবই কীর্ত্তিমান। সেই মধ্যযুগ থেকে বিংশ শতাব্দির প্রায় মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত তাঁর কীর্ত্তিতে সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে যেমন চার পাঁচটি মন্দির নির্মাণ হয়েছে তেমনি সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর কীর্ত্তিযশা কাহিনী। প্রতাপাদিত্যের পতনের কিছু কালের মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গোপালপুর এলাকা জনশুন্য হয়ে পড়লে অধিকারীগণ বিগ্রহ নিয়ে পরমানন্দকাটিতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে শতাধিক বছর অবস্থানকালে গোবিন্দমন্দির নির্মিত হয়েছিল। পরে ফের কিছুদিন গোপালপুরে গোবিন্দদেব ছিলেন। সেখান থেকে অধিকারীগণ গোবিন্দদেবকে নিয়ে রায়পুরে (কালিগঞ্জ উপজেলায়) বসবাস করেন। সেখানেও মন্দির নির্মিত হয়েছিল। এর আগে কিছুদিন রামজীবনপুরে রাজ বাড়িতে রাখা হয় গোবিন্দদেবকে। রায়পুর অধিকারীদের বাড়িতে সুন্দর মন্দির ছিল। সেই কালে নূরনগরে বিশাল আকারে জাঁকজমক সহকারে দোল উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। মিত্র মহাশয় উল্লেখ করেছেন ‘‘টাকীর সুবিখ্যাত মুন্সীবংশীয় জমিদার রায় যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী ১৩১০ সালে অধীকারীদের নিকট হইতে গোবিন্দদেব বিগ্রহ চাহিয়া নিয়া টাকীর নিজ বাড়িতে রাসোৎসব সম্পন্ন করেন।” এই সময়ে নূরনগর ও কাটুনিয়ায় বসন্ত রায়ের বংশধর যারা বাস করতেন তাঁদের মধ্যে রাজা অন্নদাতনয়ের বড় পুত্র যতীন্দ্র মোহন রায় বংশ মর্যাদা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়ে গোবিন্দদেব বিগ্রহ পূর্ণঃউদ্ধার করেন, তবে এ নিয়ে কয়েক দফায় অধিকারীদিগের সাথে কাটুনিয়ার রাজা ও বাজিতপুর পরগনার মালিক লাড্ডিমোহন ঠাকুর দিগের সাথে মামলা হয়েছে। পরে গোবিন্দদেব রাজা যতীন্দ্রমোহনের হস্তগত হয়। এ সময় তাঁরই ইচ্ছায় শ্রীপুর নিবাসী সতীশচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের অর্থানুকুল্যে কাটুনিয়া রাজবাড়ির সম্মুখ চত্ত্বরে দুই গম্বুজ বিশিষ্ট (আনুমানিক ১০০ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৯১৪-১৫ খ্রিস্টাব্দে) গোবিন্দ জিউর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে সেই গোবিন্দদেবই আজও দোল উৎসবে এই মন্দিরে পুজিত হন। অতীতে এখানে নানা আয়োজনে দোল উৎসব পালিত হতো এবং হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো।

তুলনামূলক ঐতিহাসিক গুরুত্ব ঃ
বর্তমান বাংলাদেশে অনেক মন্দির আছে, যেমন দিনাজপুরে কান্তজির মন্দির, নওগাঁয় মান্দা রামঠাকুর মন্দির, পাবনা হান্ডিয়ার জগন্নাথদেব মন্দির, সুগন্ধায় ভবানী মন্দির, কিশোরগঞ্জে কবি চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির, সাতক্ষীরার ঈশ্বরীপুরে যশোরেশ্বরী পীঠ মন্দির, গোদাগাড়ি নরোত্তম ঠাকুরের মন্দির, ড্যামরাইল নবরতœ সভা মন্দির (কালিগঞ্জ) চিটাগাং করালডাঙ্গায় সন্যাসী পাহাড়ে দূর্গামন্দির, (মেধস মুনির আশ্রম!) সীতা মন্দির, ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির সহ বেশ কিছু প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মন্দির দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে। এগুলির মধ্যে সন্যাসী পাহাড়ের দূর্গামন্দির, সুগন্ধার ভবানী মন্দির, যশোরেশ্বরী পীঠ মন্দির, সীতা কুন্ডু সহ বেশ কিছু মন্দির কিংবদন্তিতুল্য বিধায় প্রাচীনত্বের দাবি রাখে। মধ্যযুগে অর্থাৎ ও ষোড়ষ শতকের শেষে বিশেষ করে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে রাজা বিক্রমাদিত্য, প্রতাপাদিত্য ও বসন্ত রায় তৎকালিন যশোহর রাজ্যে মন্দির, মসজিদ, গীর্জা নির্মাণ করে যে মানবতা বাদী চেতনার নিদর্শন স্থাপন করেছেন তা ইতিহাসে বিরল। সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে সেই যুগে তাঁরা ড্যামরাইল নবরতœ সভামন্দির, গোপালপুর গোবিন্দদেব মন্দির, যশোরেশ্বরী,কালীকা মন্দির, বেদকাশীতে উৎকলেশ্বর শিব মন্দির, ঈশ্বরীপুরের টেঙ্গা/শাহী মসজিদ, যীশু-খ্রিষ্ট্রের গীর্জা সহ অন্যান্য কীর্ত্তিগাঁথা নির্মাণ করে সাম্যবামী মানব উন্নয়ন, স্বাধীনতা চেতনা, বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলার সিকড় সন্ধানী ইতিহাসের ক্ষেত্রে গোপালপুরে অবস্থিত গোবিন্দদেবের ভগ্ন মন্দির মালা যথেষ্ট প্রত্মতাত্বিক গুরুত্ব বহন করে। এগুলি সংস্কার এবং সংরক্ষণ হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, লোকজ সংস্কৃতির তথ্য সংগ্রাহক, মোবাইল নং-০১৭২১৫৬১৫২

Use Facebook to Comment on this Post

Leave a Reply

Editor : ISHARAT ALI, 01712651840, 01835017232 E-mail : satkhiranews24@yahoo.com, rangtuli80@yahoo.com


Site Hosted By: WWW.LOCALiT.COM.BD