23 September 2017 , Saturday
Bangla Font Download
সর্বশেষ খবর »

You Are Here: Home » কলাম » সনাতনী সংস্কৃতি ও চেতনাজাগরণে দেবীদূর্গা : অরবিন্দ মৃধা

orbindu
(এক)
সৃষ্টির শুরু থেকে মহামায়া দেবীর স্তুতি চলে আসছে। স্বয়ং ব্রহ্মাই আসুরিক শক্তির হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য সর্বপ্রথম যোগমায়া দেবীর বন্ধনা করেছেন। এরপর দেবতাগণ যতবার অসুরিক শক্তির কাছে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন ততবারই মহামায়ার সাহায্যে জগৎ সংসারে শান্তি স্থাপন করেছেন। মহামায়া তবে কি? এক কাথায় মহামায়া জীবাশ্রয়ী আত্মপ্রত্যয়ী সুপ্ত শক্তি। এই শক্তি শুধু শারিরীক শক্তি নয়, চেতনা শক্তি, বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান, জন, ধন শক্তি ছাড়াও জড় -জীবের অভ্যন্তরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা আদিশক্তি। যুগে যুগে অশুভ, অকল্যাণ, অনিয়ম, অবিচার, অবজ্ঞা অন্যায়কে রুখে দিতে কোন না কোন মাধ্যমে শক্তির প্রয়োগ ঘটেছে। চন্ডি, মার্কেন্ডেয় পুরাণ, পুরাণ ও অন্যান্য গ্রন্থের বর্ণনায় আদিকালে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে বার বার যুদ্ধ হয়েছে। দেবতাগণ পরাজিত হয়ে আরাধনা করে জগদ্ধাত্রী, কাত্যায়নী, বাসন্তী, কালী, দূর্গা নানারুপে সেই মহামায়ার শক্তির আগমন ঘটিয়ে অন্যায় অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে জগৎ সংসারে শান্তি স্থাপন করেছেন, পৌরানিক এমন উদ্ধৃতি ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যুুগ যুগ ধরে দূর্গা সহ নানা দেব-দেবীর সাকার রূপ কল্পনায় মুর্তি পূজার প্রচলন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আমরা সংক্ষিপ্ত ভাবে বুঝতে চেষ্টা করব সনাতনী সংস্কৃতি, ধর্ম ও চেতনা জাগরণে দেবীদূর্গার ভূমিকার কথা।
durgo puju
(দুই)
প্রতীমা পূজার কারণ ঃ
ধর্মীয় বৈদিক শাস্ত্রগ্রন্থ মতে যাগযজ্ঞ পালনের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা, ঈশ্বর বা ভগবানের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে মুর্তি বা প্রতিমা পূজা অসার। নিরাকার ব্রহ্ম বা পরমপুরুষ হিসেবে কেউনা কেউ আছেন। যজ্ঞ ও সাধনা বা সুরের যোগে তাকে পাওয়ার জন্য ভক্তগণ শাস্ত্রীয় বিধান মতে সাধনা করে থাকেন। উপনিষদে উল্লেখ আছে ‘তং বেদং পুরুষ মৃত্যু পরিব্যাথা’ … যাকে জানার, সেই পরমপুরুষকেই জানো নইলে তো মরণ বেদনা।
সনাতনী হিন্দু সংস্কৃতিতে তন্ত্রশাস্ত্র মত প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। তান্ত্রিক মতে পূজায় প্রতীক বা প্রতিমা থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে পূজার সকল অর্ঘ প্রতিমা বা মুর্তিকে অবলম্বন করে আবর্তমান। আর বৈদিক মতে, অগ্নিকে সকল শক্তি বা দেবতার উৎস বিশ্বাস ধারণ করে অগ্নিতে দেবতার উদ্দেশ্যে যজ্ঞাহুতি প্রদান করা হয়। আগুন বা অগ্নিকে পবিত্র বা নির্মল শক্তি হিসেবে গন্য করা হয়। অগ্নিতে সকল মোহ দ্বেষ, কাম-ক্রোধ বিসর্জ্জন দিলে আত্মশুদ্ধি ঘটে। এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ ধর্ম সাধক ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী তাঁর ‘পূজাতত্ত্ব’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ স্থাপনের শ্রেষ্ঠ উপায় বৈদিক মতে ‘যজ্ঞ’ এবং তান্ত্রিক মতে ‘পূজা’। যজ্ঞে কোন মুর্তির আবশ্যকতা থাকে না। অগ্নিকে সকল দেবতার মুখ ভাবনায় (অগ্নিমুখা বৈ দেবতাঃ) একমাত্র অগ্নির মাধ্যমেই সকল দেবতার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ দ্রব্যাদির সমর্পণ চলে। পূজায় কিন্তু প্রতিমা অপহিার্য। ঈশ্বরের সঙ্গে কুটুম্বিতাকে অন্তরঙ্গ ও প্রগাঢ় করিতে হইলে অর্চনাই সর্বাধিক শক্তিশালী।’
সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন এ বিশ্বাস মানুষ পোষণ করে এবং তিনি নিরাকার, তিনি সর্বত্রই বিরাজমান। তিনি করুনাময় জীব-জগতের পালন কর্তা। মানুষের মন অতি চঞ্চল, কল্পনায় অবগাহন করে চোখের নিমিষে কেউ বিশ্বব্রহ্মানন্ড ঘুরে আসে, কেউ গাড়ি, বাড়ি, বিত্ত, বৈভব বৃত্তি গড়ে তোলে, আবার কেউ সেই নিরাকারের নির্দিষ্ট রুপ কল্পনার মধ্য দিয়ে গুনসম্পন্ন দেব-মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলে। অন্তরের খাঁটি বিশ্বাস দ্বারা ধর্ম জেগে ওঠে কর্মের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে নিরাকার সৃষ্টিকর্তার আরাধনার লক্ষ্যে তাঁর একটি রূপ বা মুর্তি স্থাপনের মাধ্যমে শ্রদ্ধাভরে পূজো অর্চনা, গুনগান করে সাধনায় সিদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সাধারণ ভক্তগণ প্রতিমা পূজা করে থাকেন। ঈশ্বর, ভগবান বা পরমপিতার শক্তি সর্বত্রই বিরাজমান। অদৃশ্য সেই মহাশক্তিকে নিরাকার ভাবনা ধ্যান বা যজ্ঞের দ্বারা আয়ত্ব করা সাধারণ ভক্তের জন্য দুসাধ্য ব্যাপার। কেননা সংসারে স্বাত্ত্বিক রাজষিক, তামষিক এই তিন গুণের মানুষ আছে। বর্তমান সময়ে তামষিক ও রাজষিক মানুষের সংখ্যা বেশি। তাই দেব-দেবীর মুর্তি বা প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে সাধন ভজনে দ্রুততার সাথে নিবিষ্ট হওয়া বা মনোনিবেশ করা সম্ভব। তন্ত্রশাস্ত্র বলেছে, ‘ গাভীর দুগ্ধ তাহার রক্ত হইতে সম্ভুত। রক্ত গাভীর সর্বাঙ্গেই বিরাজিত তাই বলিয়া গাভীর যে কোন অঙ্গে হস্থার্পণ করিলেই দুগ্ধ পাওয়া যায় না। একমাত্র স্তন হইতেই উহা ক্ষরিত হয়। সেই শ্রী ভগবানের উপস্থিতি সর্বত্র সকল সময়ে থাকিলেও তাঁহার স্বরূপ উপলদ্ধি প্রতিমাতেই সর্বাঙ্গসুন্দররূপে হইয়া থাকে।’ শ্রীমদ্ভাগবত শাস্ত্র অষ্ট প্রকার বিগ্রহের কথা বলেছেÑ
‘শৈলী দারুময়ী লৌহ লেপ্যা লেখ্যা সৈকতী।
মনোময়ী মনিময়ী প্রতিমাষ্টবিধা স্মৃতা॥’
শিলাময়ী, কাষ্টময়ী, লৌহা (সুবর্ণাদিময়ী) লেপ্যা, (মৎচন্দনাদিময়ী) লেখ্যা (চিত্রপটময়ী) ঝারুকাময়ী, মনোময়ী ও মনিময়ী এই আট প্রকার প্রতিমা হইতে পারে।’ (তথ্যসূত্র মঙ্গলালোক শারদীয় দূর্গোৎসব প্রকাশনা-১৪২০, অগ্রনীব্যাংক ভবন, মতিঝিল ঢাকা-১০০০, পৃষ্ঠা-১৬)। তাই মানবজীবনকে স্বার্থক করে তুলতে স্ব স্ব আরাধ্য দেবতা, ঈশ্বর, ভগবান, পরমপিতা যে যে নামেই সম্বোধন করুন না কেন সেই নিরাকার অসীমকে একটি রূপকল্পের গন্ডিতে এনে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সাধন-ভজন করলে তাঁকে পাওয়ার উচ্ছাসে জীবন আন্দময় হয়ে ওঠে এবং সেখানেই প্রতিমা পূজা বা যজ্ঞের সার্থকতা। ভগবদ্ গীতায় বলা হয়েছে,‘ ময়া তশুমিদং সবং জগদব্যক্ত মুর্তিন।’ অর্থাৎ আমি অব্যক্তরূপে জগৎ সংসার ব্যপিয়া আছি। যিনি ব্যক্ত সাকার; তিনিই অবতার, আবার অব্যক্ত অবস্থায় নিরাকার। অর্থাৎ প্রতীক বা প্রতিমা অব্যক্ত নিরাকার ব্রহ্ম বা আরাধ্য দেবতার প্রতিনিধি। স্বামী অক্ষরানন্দজী বলেছেন, ‘নিরাকারে, অরূপে সেই পরমপুরুষকে না বুঝতে পারলেও সাধক সাকারে দেবতা করে তাঁরই স্বরূপ রসে আপ্লুত হয়।’
(তিন)
দূর্গাদেবীর আদি কথা ঃ
শারদীয় দূর্গাপূজা বাঙালি সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশেষ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে যুগযুগ ধরে চলে আসছে। কালের আবর্তে এটি প্রধান উৎসবে পরিনত হয়েছে। ধর্মবর্ণ-গোত্র নির্বিশেষ সবশ্রেনীর মানুষের মাঝে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে একটা বিশেষ সাড়া পড়ে যায়। যেহেতু এটি ধর্মীয় উৎসব, তাই এ পূজোউৎসবের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকা স্বাভাবিক। সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ অজেয় শক্তির আরাধনা করে আসছে। বলা যায় ভয় থেকে ভক্তি ভাব ও ধর্ম চিন্তার উৎপত্তি হয়েছে। মানুষের জ্ঞান-দর্শন ও শক্তির বাইরে যে অজেয় শক্তি বা দর্শন তাকেই মানুষ পূজার্চনা বা আরাধনা করে আসছে। দেবীদূর্গাকে বলা হয় আদ্যাশক্তি মহামায়া।
শ্রীশ্রীচন্ডি গ্রন্থের পৌরানিক কাহিনীতে এই দেবীমহাত্ম্যে সাতশত মন্ত্র, পঁাঁচশত আটাত্তরটি শ্লোকের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে।
“ আস্মিন্ দেব্যাঃ স্তবে পূণ্যে মন্ত্রাঃ সপ্তশতং শিবে”।
শ্রীশ্রী চন্ডিতে বর্ণিত হয়েছে , ‘সর্বপ্রথম এই দেবীমহাত্ম মেধাঃ নামক মুনি রাজা সুরথ (রাজ্য থেকে বিতাড়িত) ও বৈশ্য সমাধি (সংসার থেকে বিতাড়িত) নিকট বর্ণনা করেন। সেই কাহিনী পরে মার্কন্ডেয় মুনি তাঁর শিষ্য ভাগুরির নিকট বলেন। ভাগুরি দ্বারা কথিত সেই বিবরণ পরে দ্রোণ মুনির পক্ষিরূপী চার পুত্রকে” (পিঙ্গাখ্য, বিরাধ, সূপুত্র ও সুমুখ) বলেন। পরবর্তীকালে মহাভারতের রচয়িতা মহামুনি ব্যাসদেবের শিষ্য জৈমিনি গুরুর আদেশে বিন্ধ্যা পর্বতে দ্রোণ মুনির অভিশপ্ত পক্ষীরূপী উল্লেখিত চারপুত্রের নিকট থেকে দেবীমহাত্ম শুনেন। উল্লেখ্য পক্ষিরূপী মুনিপুত্রগণ তপস্যাবলে জ্ঞানবান ছিলেন এবং মানুষের মতো কথা বলতে পারতেন। (সূত্র: শ্রীশ্রী চন্ডি, ষট্ সংবাদ কথা)। অতএব দেখা যাচ্ছে অতিপ্রাচীন যুগ থেকে দেবীশক্তির আরাধনা চলে আসছে লৌকিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে।

(চার)
সুরথ সমাধির দেবীবন্দনা ও বরলাভ
মানুষের সকল প্রকার কর্ম ও ধর্মাচার লোকজ সংস্কৃতির ধারায় বিশ্বাসের ভিত্তিতে অনুকরণের মাধ্যমে চলে আসছে। দূর্গাপূজো প্রচলনের ইতিবৃত্ত অনুসন্ধানে জানা যায় পুরাকালে রাজা সুরথ নামে এক ব্যক্তি রাজ্য হারিয়ে একাকী বনোবাসী হন এবং সমাধি বৈশ্য নামে এক ব্যক্তি সংসারে অশান্তির কারণে মনের দুঃখে বনোবাসী হন। একদা এ দু’জন ঘুরতে ঘুরতে ধ্যানমগ্ন মহর্ষি মেধস এঁর আশ্রমে গিয়ে তাঁর কাছে নিজ নিজ দুঃখ দূদর্শা ও বনবাসী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। সবশুনে মুনি মেধাসঃ তাঁদের কাছে মহামায়া মহাত্ম্য এবং দেবতা ও অসুরদের মধ্যে বারবার সংঘটিত যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে দেবী আরাধনার উপদেশ দেন।
তিনি বললেন,‘ হে মহারাজ (সুরথ) তাং পরমেশ্বরীং শরনম উপৈহি, স-এব আরাধিতা। নৃনং ঘোবস্বর্গাপবর্গদা ভবতি’ অর্থাৎ সেই দেবী পরমেশ্বরীর শরন লও, তাঁহারি আরাধনা করিলে তিনি মানবের সুখ ভোগ, স্বর্গ এবং মুক্তিদানকারিনী হইয়া থাকেন। মহামুনির কথা শুনে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি দেবীর দর্শন পাওয়ার জন্য নদীতীরে অবস্থান নিয়ে দেবীসূক্ত জপ করতে করতে কঠোর তপস্যায় মগ্ন হলেন। তাঁরা সেই নদী তীরে দেবীর মাটির প্রতিমা নির্মাণ করে ফুল, ফল, ধুপ, দ্বীপ প্রজ্বলন করে নিষ্ঠার সাথে পূজা আরাম্ভ করলেন। এসময় তাঁরা কখনো আহার করে, কখনো উপবাস থেকে দেবীর ধ্যানে জিতেন্দ্রিয় হয়ে শরীরের রক্ত বলিদান দিয়ে জগদ্ধাত্রী চন্ডিকা দেবীকে তুষ্ট করলেন।
“এবম্ সমারাধয়তোঃ স্ত্রিভির্ব্বর্যৈর্যতাত্মনোঃ।
পরিতুষ্ঠা জগদ্ধাত্রী প্রত্যক্ষং প্রাহ চন্ডিকা”॥১৩/১২ (শ্রী শ্রী চন্ডি)
অর্থাৎ এইরূপে তাহারা দ্ইুজন মন সংযত করিয়া তিন বৎসর আরাধনা করিলে জনদ্ধাত্রী চন্ডিকা তুষ্ট হইয়া দেখা দিলেন।
তখন রাজা সুরথ এই জন্মেই নিজ শক্তিদ্বারা শত্র“ সৈন্য বিনাশ পূর্বক রাজ্য লাভ পরজন্মে তাহা কখনো নষ্ট হবে না এমন বর এবং সমাধি বৈশ্য সংসারের প্রতি অভিমান নাশ সহ তত্বজ্ঞান বার্তে লাভ হয় এমনটি বর প্রার্থনা করলেন। তখন দেবী মহামায়া তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী বর দিলেন।
স্বল্পৈরহোভির্নৃপতে! স্বরাজ্যং প্রপ্স্যাতে ভবান্॥ ১৩/১৯
হত্বা রিপুনস্থলিতং তব তত্র খবিষ্যতি॥ ১৩/২০
অর্থাৎ দেবী বললেন, হে নৃপতি (মহারাজ) তুমি স্বল্প দিনের মধ্যে নিজ রাজ্য ফিরে পাবে। এবং শত্র“দের হত্যাকরে সেখানে ভবিষ্যতে তুমি অস্খালিত রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। আর বৈশ্য কে বললেন,
বৈশ্যবর্য্য! ত্বয়া যশ্চ বরোহস্মত্তোহতি বাঞ্চিতঃ॥ ১৩/১৯
তং প্রযচ্ছামি সংসিদ্ধ্যৈ তব জ্ঞানং ভবিষ্যতি॥ ১৩/২০
অর্থাৎ হে বৈশ্যশ্রেষ্ঠ তুমি আমার নিকট যে বর প্রার্থনা করেছ তা দিচ্ছি। তুমি মুক্তিলাভের উপযুক্ত ভবিষ্যতে অর্জন করতে পারবে। মহামুনি মাকন্ডেয় শ্রীশ্রী চন্ডি গ্রন্থে এই ভাবে দেবী মহাত্ম্য বর্ণনা করে বলেছেন, ‘ দেবী তাহাদিগকে তাঁহাদের ইচ্ছামত এইরূপ বর দিবার পর সুরথ ও সমাধি ভক্তির সহিত তাঁহার স্তব করিলে, তিনি তৎক্ষনাৎ অদৃশ্য হইয়া গেলেন।’
এবং দেব্যা বরং লদ্ধ্যা সুরথঃ ক্ষত্রিয়র্ষভঃ॥ ১৩/২৮
সূর্যজ্জন্মে সমাসার্দ্য সবর্নির্ভবিতা মনুঃ ॥ ১৩/২৯
অর্থাৎ ক্ষত্রিয়শেষ্ট রাজা সুরথ এইরুপে দেবীর নিকট হইতে বরলাভ করিয়া সূর্যদেব হইতে জন্মিয়া সাবর্ণি নামে মনু হইবেন।
(পাঁচ)
দূগা পূজো ও নামের উৎপত্তি ঃ
দুগর্তি নাশিনী দূগা অর্থাৎ যিনি দুর্গতদের দুঃখ, দুদর্শা, দুর্গতি বিনাশ করেন তিনিই দূর্গা। দূর্র্গ অর্থ পরিরোধকারী বেষ্টনী। যখন কোন অশুভ শক্তি প্রকৃতির সৃষ্টিকে অন্যায় অত্যাচারের মাধ্যমে ধ্বংস করার চেষ্টা করে বা তান্ডব চালায় তখনই মহাশক্তি মহামায়া এক এক নামে আর্বিভূত হয়ে দুর্গতদের পরিত্রাণ করেন। শ্রী চন্ডি মতে যোগনিদ্রা মগ্ন ভগবান শ্রী বিষ্ণুদেব মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরকে বধ করে ব্রহ্মাকে রক্ষা করেন। এরপর মহিষাসুর নামে এক অসুর প্রবল পরাক্রমশালী হয়ে দেবতাদের রাজ্য জয় করে নেয়।তখন রাজ্য হারা দেবতাগণ মর্তে আশ্রয় নিয়ে ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং দেবাদিদেব শিবের স্মরাপন্ন হয়ে তাঁদের দুঃখ দুদর্শার কথা জানালেন তাঁরা আদ্যশক্তি মহামায়ার স্মরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন। দেবতাগণ নানা স্বত স্তুতির মাধ্যমে মহামায়াকে সৃষ্টি করে মহিষাসুর বিনাশের প্রার্থনা জানান। দেবীরূপী মহামায়া নানা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অত্যাচারী মহিষাসুরকে বধ করলে দেবতাগণ সানন্দে উৎসব ও দেবীকে নানাভাবে স্তব স্তুতি করে বললেন, হে দেবী ভগবতী, তুমি শত্র“ মহিষাসুরকে বধ করেছ। হে মহেশ্বরী আমরা বার বার তোমাকে স্মরণ করলে তুমি আমাদের সকল বিপদ দূর করিও বলে প্রার্থনা জানালেন,
‘যশ্চ মর্ত্ত্য স্তবৈরেভি স্ত¡াং স্তোয্যত্যমলাননে।
তস্য বিত্তর্দ্ধিবিভবৈধন দারাদি সম্পাদাম্॥ ’৪/৩৬
অর্থঃ হে অমলানয়নে, হে নির্মলবদনী দেবী, হে অম্বিকে! যে মানব এই স্তব দ্বারা তোমার স্তব করিবে আমাদের প্রতি প্রসন্ন এই তুমি তাহার ধন, সম্পদ, বিভব, পতœী পুত্র প্রভৃতি বৃদ্ধি করিবে।
অর্থাৎ মর্তের মানুষ যাতে দেবী মহাত্ম জেনে তাঁকে পূজা করতে পারে তেমন বর ও দেবতাগণ মানুষের জন্যে প্রার্থনা করে নিলেন। আর এ কারণেই দেবী প্রতিমার সাথে মহিষাসুরের অবস্থান। কারণ শ্রী চন্ডি গ্রন্থের বর্ণনামতে মহিষাসুর বধের পূর্বে ও পরে মধু-কৈটভ,ও শুম্ভ নিশুম্ভ কে বধ করেছেন।
মহামায়া দূর্গানামে যেভাবে পরিচিত হয়েছেন সে বিষয়ে এইরূপে বর্ণিত হয়েছে,
ভূয়শ্চ শতবার্ষিক্যাম-নাবৃষ্ট্যাম নম্ভসি।
মুনিভিঃ সংস্তুতা ভূমৌ সম্ভবিষ্যাম্যযোনিজা॥ ৪৬(১১ অধ্যায়)
অথাৎ (ভূয়শ্চ) আবার শতবর্ষ ধরে অনাবৃষ্টির সময়, মুনিগণ আমার স্তব করবেন, তখন আমি অযোনি সম্ভবা হয়ে জন্মিবো। তখন বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত নিজের শরীর থেকে উৎপন্ন প্রাণ বাঁচাবার উপযোগী শাকের দ্বারা সমস্ত লোককে পোষন করিব। তখন তিনি পৃথিবীতের শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হবেন। এসময় দুর্গম নামে মহাসুরকে বধ করে দূর্গাদেবী নামে খ্যাত হবেন।
তত্রৈব চ বধিষ্যমি দুর্গমাখাং মহাসুরম।
দূর্গাদেবীতি বিখ্যাতং তন্মে নাম ভবিষ্যতি॥ ১১/৫০
অর্থঃ- এবং সেই সময়ে দুর্গম নামক মহাসুরকে বধ করিব তখন আমার এই দুর্গাদেবী নাম বিখ্যাত হবে।
দয়াময়ী করুনাময়ী দেবী তাঁর ভক্তদের অভয় দিয়ে বলেছেন,
ইথং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি।
তদা তদাবতীর্য্যাহং করিষ্যাম্যরি সংক্ষয়ম্ ॥ ১১/১৫
অর্থঃ- এইরূপ যখন যখন দানবজানিত পীড়া বা অত্যাচার হবে আমি সেই সেই সময়ে অবতীর্ণ হয়ে শত্র“নাশ করব।

(ছয়)
দূর্গাপূজোর উৎপত্তি বাংলাদেশে !
বাঙালি সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা। এই পূজার প্রচলন কবে কখন থেকে প্রচলন হয়েছে সেটা দিনক্ষন নিরুপন করে সময়ে গন্ডিতে আটকানো একটা দুরুহ ব্যাপার। তবে ঐতিহাসিক তথ্যতত্ত্বের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে তিন হাজার বছরের গন্ডিতে ফেলা যায় কেননা অঙ্গ বঙ্গ, পুন্ডবর্ধনের সভ্যতা সাতশত বছরের মধ্যে পড়লে এরও পূর্বে মৌয্য, গুপ্ত বংসের শাসন, শশাঙ্কের রাজত্ব আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ আক্রমনের কাল। খৃষ্টপূর্ব আটশত বছরের পূর্বে ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ও জৈন সভ্যতার বিকাশ, এরও পূর্বে ব্রহ্মান্যযুগের সভ্যতা, বন্য ও নিুঞ্চলে ‘কিরাত’ ‘সরব’ বা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বসবাসের সময় ধরা হয়। সু-প্রাচীন যুগের পর এই যুগকে মেধস মুনি এবং রাজাসুরথ সমাধি বৈশ্যে যুগ ধরা যায়।
ভারতবর্ষীয় সভ্যতার সুতিকাগার হিমালয় সহ অন্যান্য পাহাড় কেন্দ্রিক। অতি প্রাচীন যুগেও যে সু-সভ্য রুচিশীল সংস্কৃতিবান মানুষ ছিল এ কথার সত্যতা প্রমাণ করে। প্রাচীন ভারতবর্ষের মেশোপটেমিয়া, হরপ্পা, মোহেঞ্জদাড়ো, মহাস্থানগড় সহ অন্যান্য সভ্যতার নিদর্শন থেকে দূর্গাপূজার প্রচলন কিভাবে হলো সে বিষয়ে পুর্বেই বলা হয়েছে। শ্রী শ্রী চন্ডি, ব্রহ্মব্বৈর্ত পুরান ও অন্যান্য পৌরানিক গ্রন্থে মহামায়ার নানা রুপের কথা আছে। তবে মেধসঃ নামক মুনি এর প্রথম প্রবক্তা। দেবী মহাত্মা প্রথমে যাদের কাছে বলা হয়েছে তাঁরা দুজই লাঞ্চিত, আত্ত্বজিজ্ঞাসু রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য। এ বিষয়ে শ্রী শ্রী চন্ডিতে বলা হয়েছেÑ
মেধাস্ত কথায়ামাস সুরথায় সমাধয়ে
সা কথা কথিতা পশ্চাৎ মার্কন্ডেয়েন ভাগুরৌ॥
এই দেবী ও পূজার ফল বিষয়ের মানুষের কাছে উপস্থান করেছেন মুনি মেধসঃ এবং তাঁর আশ্রম চট্টোগ্রাম জেলার করালডাঙ্গা বয়ালখালী সন্যাসী পাহাড়ে যার নিদর্শন আজও বিদ্যমান। মেধসঃ মুনির এই আশ্রমের অবস্থান বিষয়ে স্বামী পরদেবানন্দজী মহারাজ তাঁর ‘তীর্থের পথে পথে গ্রন্থে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম শহর থেকে বত্রিশ মাইল দূরে করালডাঙ্গা সন্যাসী পাহাড়ের এই মেধস মুনির আশ্রম অবস্থিত। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রায় পাঁচশতফুট উচুতে বি¯তৃত এলাকা জুড়ে এই আশ্রম। আশ্রম অঙ্গনে নাতিবৃহৎ শ্রী শ্রী দূর্গামন্দির এই মন্দিরের অনতিদূরে পাহাড়ের গায়ে আছে। মার্কেন্ডের মুনির ধ্যানের আসন এবং মার্কন্ডেয় কুন্ড এবং আছে সীতা সরোবর।’
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নদী তীরবর্তী মেধসঃ আশ্রমে শ্রী শ্রী দূগাপূজা সমাপন করে দেবী প্রতিমা বেতসা নদীগর্ভে বিসর্জন দিয়েছিলেন। সভাবতই প্রশ্ন জাতে কোথায় সেই বেতসা নদী। এ বিষয়ে স্বামী পরদেবানন্দজী উল্লেখ করেছেন, কামাক্ষ্যা তন্ত্রের ৩৫তম পটলে মেধসাশ্রমের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ
“কর্ণফুলিং সমারভ্য যাবদ্দাক্ষিণে সাগরম্ ।
পূর্ণক্ষেত্রামিদং প্রোক্তং মুনিগন -সেবিতম
তত্রাস্তি বেতসা নাম্মী দিব্যা পূর্ণতোয়ানদী।
তত্রৈবাসীম্মুনী শ্রেষ্ঠ মেধসঃ ঋষিরাশ্রম॥”
‘দক্ষিণে সাগর কর্ণফুলি নদী এলাকায় মুনিগনের সেবারপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে বেতসানামে পূর্ণ নদী সেই নদী এলাকাতেই বনমধ্যে শ্রেষ্ঠ মুনি মেধসঃ এঁর ধ্যানাশ্রম’।
‘পাল রাজাদের সময় বাংলায় তন্ত্রের বিপুল প্রভাব ছিল। তবে উল্লেখ আছে ‘গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যা’ অর্থাৎ গৌড়ে তন্ত্র বিদ্যার উদ্ভব হয়েছে। এই বাক্যটিই ইঙ্গিত বহন করে যে, শ্রীশ্রী দূর্গাপূজার উৎপত্তি স্থান বাংলাদেশে। প্রায় সবকটি তন্ত্র যখন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে’… উৎপন্ন তখন শ্রীশ্রী চন্ডি রুপিনী দূর্গাদেবীর পূজা ও সর্বপ্রথম বাংলাদেশে প্রচলন হয়েছিল।’ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও পন্ডিতগণ তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে যুক্তি দিয়ে মেধসমুনির আশ্রমস্থল বাংলাদেশেই চিহ্নিত করেছেন। স্বামী জগদীশ্বরানন্দজী মহারাজ সম্পাদিত শ্রীশ্রী চন্ডিগ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কারো কারো মতে শ্রীশ্রী চন্ডি নর্মদা অঞ্চলের উজ্জয়িনীতে উৎপন্ন। কিন্তু অধ্যাপক দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী ঐতিহাসিক যুক্তি দিয়ে উক্ত মত খন্ডন করে প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহর থেকে বত্রিশ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচশত ফুট উচুঁতে করালডাঙ্গায় সন্যাসী পাহাড়ে মেধস মুনির আশ্রম অবস্থিত। এই মেধসাশ্রমেই রাজ্যচুৎত সুরথ এবং গৃহ থেকে বিতাড়িত সমাধিবৈশ্য আশ্রয় নিয়ে ছিলেন।’ পূর্বেই বলা হয়েছে হিমালয় ও অন্যান্য পাহাড় কেন্দ্রিক সভ্যতা ভারতবর্ষীয় সভ্যতা। মুনিঋষিগণের পাশাপাশি সে যুগের বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির জীবনাচার সংস্কৃতির আবর্তে গড়ে উঠেছিল ভারতীয় আর্য সভ্যতা। মুনিঋষিগণ যদি ইতিহাস বেত্তা চিন্তাবিদগনের দৃষ্টিতে আর্য হয়ে থাকেন, তা হলে প্রাচীন ভারতীয়রা অনার্য হয় কি প্রকারে?
(সাত)
অকাল বোধন
অকাল বোধন ঃ শারদীয় দূর্গাউৎসবকে অকাল বোধন বলা হয়। অর্থাৎ অকালে দেবী দূর্গাকে জাগানো হয়। সনাতনী হিন্দু শাস্ত্র মতে দেখা যায় বাসন্তী, কাত্যায়নী, কালীপূজা সহ অধিকাংশ পূজাপার্বন সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ মাঘ মাস থেকে আষাঢ় মাসের মধ্যে পালন করা হয়।
হিন্দু শাস্ত্রমতে সমন্ত বছরকে উত্তরায়ন এবং দক্ষিণায়ন এই দুটি কালে ভাগ করা হয়। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত উত্তরায়ন এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত সময়কে দক্ষিণায়ন কাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উত্তরায়ন কালে দেবদেবীগণের জাগ্রত কাল এবং দক্ষিণায়ন দেবদেবীর নিদ্রাকাল। রামচন্দ্র যুদ্ধের প্রয়োজনে অকালে দেবীকে বোধন অর্থাৎ স্তব স্তুতির মাধ্যমে জাগরণ ঘটিয়ে দূর্গাপূজো করেছিলেন। এ কারণে শারদীয় দূর্গাপূজাকে অকাল বোধন বলা হয়। দেখা যায় দেবীকে নিদ্রা থেকে জাগানোর জন্য বেলতলায় মহাদেবের স্তবকরে অনুমতি নিয়ে বোধন ঘটাতে হয়।
আমাদের লোকায়ত জীবনের স্মরণাতীত কাল থেকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে দূর্গাপূজা চলে আসছে। শোড়ষ সপ্তদশ অষ্টাদশ-উনবিংশ -শতাব্দী বাঙলা বাঙালি চেতনা জাগরণের সুবর্ণযুগ। এরই ধারা বাহিকতায় বিংশ শতাব্দিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। মধ্যযুগ থেকে দূর্গা, বাসন্তী, কাত্যায়নী, কালী, শিব সহ নানান লোকজ বিশ্বাসের দেবদেবীর পাশাপাশি বিভিন্ন অবতার পুরুষের বাণী, শিক্ষা, চর্চা ও পালন পোষনের ধারাবাহিকতায় সনাতনী হিন্দু ধর্ম বিকশিত হয়েছে মানুষের চেতনায়, আর জেগেছে মানুষ। এসবের পিছনে লুকিয়ে আছে রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্যের দূর্গাদর্শন ও বরলাবের ফল। ####
(আট)
বাঙালি জীবনানন্দে দেবীদূর্গা ঃ
কবে বা কখন থেকে মহামায়া দেবী দূর্গার পূজোর প্রচলন হয়েছে সে বিষয়ে পৌরানিক কাহিনীগুলি স্বরব। রামায়নের যুগে অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র লঙ্কার রক্ষসরাজা রাবনকে বধ করে সীতা উদ্ধারের জন্য অকাল বোধন করেছিলেন। অকাল বোধনের এই বিধান এটাই প্রমাণ করে যে, রাম রাবনের যুদ্ধ যখনই শুরু হোক না কেন রাবন বধের পূর্বমুহুর্তে শ্রী রামচন্দ্র মহামায়াকে যে নামে বন্ধনা করেছিলেন সেই তিনিই দূর্গা। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয় আঠার দিন। শুক্ল পক্ষের চতুদর্শী তিথিতে দ্বাপোর যুগের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ আরম্ভের পুর্বে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মহামায়া দেবী আরাধনা করতে বলেছেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ধর্মতত্ত্ব ইতিহাস ঐতিহ্য কাহিনীগুলো কাগুজে বিধৃত হয়েছে মুদ্রণ যুগ থেকে তাই এই সব বিষয়গুলি পাওয়ার জন্য শ্র“তিধর শিলালিপি, ইষ্টকালিখন, সুবর্ণলিপি (লোহা) কাষ্ঠলিপি প্রভৃতির উপরে নির্ভর করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকে দূর্গাপুজা কি আকৃতি বা প্রকৃতিতে চলে আসছে সে বিষয়ে অধিক গাবেষণার অবকাশ রয়ে গেছে।
বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্রতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা মূলত মধ্যযুগ থেকে শুরু হয়েছে, আর এ ভাষা জাগরণের অন্যতম প্রবক্তা শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু এবং তার অগনিত ভক্তশীর্ষ। কারণ তিনি তার সাম্যবাদী মানবধর্ম প্রচার বাংলাতেই করেছিলেন। পাঠান শাসনের শেষ দিকে ভারতবর্ষে মোঘল শাসন বিস্তারলাভের সাথে সাথে বাংলার বারো ভুঁইয়ারা প্রভাব বিস্তার করে। শোড়ষ শতকে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ন ছিলেন একজন প্রাঞ্জ প্রভাবশালী ভুইয়া রাজা। এ যুগে তিনিই প্রথম সাড়ম্বরে দূর্গাপুজা উৎসব পালন করেন। এ বিষয়ে ঐতিহাসিক শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেছেন, ‘তিনিই (রাজা কংসনারায়ন) বঙ্গে দূর্গোৎসব নামক মহাযজ্ঞের প্রথম প্রবর্তন করেন। সমগ্র বঙ্গের ভুঞা নৃপতিগণ অবনত মস্তকে তাহার উপদেশ গ্রহণ করতেন।’ ‘তিনি বারেন্দ্রকূলের প্রধান সংস্কারক এবং তদানীন্তন বাঙালি হিন্দু সমাজের নেতা ছিলেন।’ (সূত্র ঃ বঙ্গ বঙ্গেভুঞা, যশোহর, খুলনার ইতিহাস ২য় খন্ড পৃষ্ঠা-১৯-২০)
জনশ্র“তি আছে প্রাচীন কালের অশ্বমেধ যজ্ঞের ন্যায় বহু অর্থ ব্যয় করে রাজা কংসনারায়ন মাটির প্রতিমা দ্বারা দূর্গাপূজার প্রচলন করেন। তাঁরই অনুকরণে ভাদুড়িয়ার রাজা জগৎনারায়ন কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করে বসন্ত কালে বাসন্তী দূর্গোৎসব পালন করেছিলেন। সেই যুগে ভূঁইয়া রাজাদের কেউ কেউ শক্তির দেব দেবীর আরাধনা করতেন। যেমন বার ভূইয়াদের অন্যতম যশোহরের রাজা প্রতাবাদীত্ত্ব স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে যশোরেশ্বরী কালিকা মায়ের মন্দির পূনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন। ভারতচন্দ্র রায় গুনকর তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে লিখেছেন
যশোর নগর ধাম প্রতাপ আদিত্য নাম
মহারাজা বঙ্গজ কায়স্থ।
নাহি মানে বাদশায় কেহন নাহি আটে তায়
ভয়ে সব ভূপতি দ্বারস্থ
বরপুত্র ভবানীর প্রিয়তম পৃথিবীর
বাহান্ন হাজার যার ঢালী
ষোড়ষ হলকা হাতি, অযুত তুরঙ্গ সাতি
যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী॥
মধ্যযুগে এই সময় থেকে শক্তিপূজা সহ অন্যান্য পূজা পার্বনের দিকে মানুষের দৃষ্টি সজাগ হতে থাকে। বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুরে উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ সেই মন্দির বিদ্যমান। যশোশ্বেরী পীঠ মন্দির প্রতিষ্ঠার পর সেই ষোড়শ শতক থেকে পূজিত হয়ে আসছেন। এ সংস্কৃতিকে ঘিরে বাঙালি সনাতনী সংস্কৃতি ও চেতনা জাগরণে এ অঞ্চলে নানা দেবদেবী পূজা পালা পার্ব্বন মেলার উদ্ভব হয়েছে। সুদীর্ঘ কাল ধরে যশোরেশ্বরী মন্দিরে শনি মঙ্গলবারে মায়ের পূজা হয়ে আসছে। প্রতিবছর শ্যামাকালী পূজা উপলক্ষ্যে সাড়ম্বরে উৎসব পালিত হয়। মধ্যযুগের সেই সময়টিকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান শাসনের অবসান ঘটিয়ে মোঘল শাসন ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে জোৎদারগণ ভুঁইয়া নামে এক এক অঞ্চল অধিকার করে বেশ প্রভাব বিস্তার করে। তাদের কল্যাণে রাজা জমিদারগণ পরবর্তী সময়ে বাংলায় দূর্গা, জগদ্ধাত্রী, বাসন্তী, কালী পূজা সহ অন্যান্য পূজাপার্বনের কলেবর বৃদ্ধি পায়।

বৃটিশ শাসন পর্বপর্যন্ত মূলতঃ জমিদার জোৎদার শ্রেণীর বিত্তশালী ব্যক্তিগণ পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে দূর্গা পূজা, কালিপূজা, আড়ং সহ নানা উৎসব ও মেলার প্রচলন করেছে। বিগত ৫০ বছরে দৃষ্টি রাখলে দেখা যায় শারদীয় দূর্গাপূজো জমিদার বা বিত্তশালীদের অট্টালিকা সংলগ্ন মন্দির থেকে বেরিয়ে জনসংহতির মন্ডপ বা মন্দিরে আসন পেতে বসেছে। তবে বাংলায় বা বাঙালি মানসে দূর্গাপূজো ও উৎসব, মেলা, পালা পার্বন, জাগরণে তৎকালীন রাজা জমিদারদের ভূমিকা গুরুত্ববহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে পূজার সংখ্যা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এর সাথে ধনী, দরিদ্র, ছোট, বড় বর্ণভেদে সবশ্রেণীর মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে মায়ের পূজোর সাথে একাত্ম হয়েছেন শারদীয় দুর্গোৎসব প্রাঙ্গণে। যেন সারা বছরের দুঃখ বেদনা, ভয় সংকোচ, নিসঙ্গতা থেকে মুক্ত হয়ে মায়ের আর্শিবাদ নিয়ে সর্বশ্রেণীর মানুষের জীবনানন্দ উপভোগের উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছেন শারদীয় দেবী দূর্গা ।

Use Facebook to Comment on this Post

Leave a Reply

Editor : ISHARAT ALI, 01712651840, 01835017232 E-mail : satkhiranews24@yahoo.com, rangtuli80@yahoo.com


Site Hosted By: WWW.LOCALiT.COM.BD