24 January 2018 , Wednesday
Bangla Font Download
সর্বশেষ খবর »

You Are Here: Home » পরিবেশ » “রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেন ক্যান্সার” ধ্বংস ডেকে আনবে

।। শরিফুল ইসলাম হিরণ ।।

সম্প্রতি ঢাকায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রামপালে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে চুক্তি স্বারিত হয়েছে। তিনটি চুক্তির মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ক্রয়, কেন্দ্র বাস্তবায়ন ও সম্পুরক যৌথ উদ্যোগ। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় দু’দেশের সচিব এবং ভারতীয় হাইকমিশনার উপস্থিত ছিলেন। রামপালের সাপমারী, কাটাখালীসহ পাঁচটি মৌজায় ১৮ হাজার একর জমির উপর এই কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। ২০১৬ সালে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। বিশেষজ্ঞদের অভিমত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের ধ্বংস ডেকে আনবে। সুন্দরবন ছাড়া দেশে এখন আর তেমন বনাঞ্চল নেই। গবেষকদের ধারণা ২৩ ভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মাধ্যমে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গবেষকদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অবারিত কয়লা পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রিক এসিড বায়ুমন্ডলে নির্গত হবে। ৫০০ মেগাওয়াটের কয়লা ভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ১৮ মিলিয়ন টন সালফার ডাই অক্সাইড বাতাসে ছাড়ে। সেই হিসেবে রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৪০ মিলিয়ন টনের মত সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। এসব রাসায়নিক উপাদান বৃষ্টির পানির সঙ্গে ক্রিয়া করে এসিড বৃষ্টি ঘটাবে। মাটির উব্ররতা হ্রাস পাবে। উদ্ভিদের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুন্দরবন সংলগ্ন পশুর নদীতে পানির সংকট দেখা দেবে। সুন্দরবন বাঁচাতে এবং ওই এলাকায় গবাদি ও মৎস্য সম্পদের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছাই নির্গমন বন্ধের দাবি করেছে পরিবেশবাদীরা। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও অহংকারের প্রতীক। সুন্দরবনকে বাঁচাতে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। সেই সাথে কৃষি জমি রক্ষা কমিটির দাবি খাস জমিতে এ প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রর জন্য কয়লার পরিবর্তে ফার্নেস ওয়েল ব্যবহার বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করার জন্য পরিবেশ আন্দোলন কারীদের দাবি। সুন্দরবন কেবলমাত্র সৌন্দয্রের জন্য নয় আমাদের জীবন জীবিকার জাতীয় স্বাথেই নিশ্চিত হওয়া দরকার কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আসলেই কতখানি ক্ষতি করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি দূষণ: কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানি নির্গমন হলে তাতে বিভিন্ন মাত্রায় দূষণকারী উপাদান থাকবেই যে কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রর বেলায় ‘শূণ্য নির্গমণ’ বা ‘জিরো ডিসচার্জ’ নীতি অবলম্বন করা হয়। রামপালে ‘জিরো ডিসচার্জ’ নীতি অনুসরণ না করে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে। তরল বর্জ্য বা ইফুয়েন্ট ঘন্টায় ১০০ ঘনমিটার হারে পশুর নদীতে নির্গত করা হবে। প্ল¬্যান্ট পরিচালনা, ঘরোয়া ব্যাবহার, পরিবেশগত ব্যাবস্থাপনা ইত্যাদি কাজে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে এবং পরিশোধন করার পর পানি পশুর নদীতে ঘন্টায় ৫১৫০ ঘনমিটার হারে নির্গমন করা হবে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানি নির্গমন করা হলে নির্গত পানির তাপমাত্রা, পানি নির্গমণের গতি, পানিতে দ্রবীভূতি নানান উপাদান বিভিন্ন মাত্রায় পানি দূষণ ঘটাবে যা গোটা সুন্দরবন এলাকার পরিবেশ ধ্বংস করবে।

বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি: ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে ২৭৫ মিটার উচু চিমনী থেকে নির্গত গ্যাসীয় বজ্রোর তাপমাত্রা হবে ১২৫ ডিগী সেলসিয়াস।

বিষাক্ত ছাই : কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে।এই ফাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূতি ছাই ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করবে। কারণ এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। কিন্তু আরো ভয়ংকর ব্যাপার হলো , এই ছাই দিয়েই প্রকল্পের মোট ১৮৩৪ একর জমির মধ্যে ১৪১৪ একর জমি ভরাট করার পরিকল্পনা করা হয়েছে! এই বর্জ্য ছাই এর বিষাক্ত ভারী ধাতু নিশ্চিত ভাবেই বৃষ্টির পানি সাথে মিশে, চুইয়ে প্রকল্প এলাকার মাটি ও মাটির নীচের পানির স্তর দূষিত করবে যার প্রভাব শুধু প্রকল্প এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদিত বর্জ্য ছাই সিমন্টে কারখানা, ইট তৈরী ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যাবহারের সম্ভাবনার কথা ইআইএ রিপোর্টে বলা হলেও আসলে কোন কারখানায় এর আদৌ কোন ব্যাবাহর হবে এরকম কোন নিশ্চিত পরিকল্পনা করা হয়নি । বড় পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেই উৎপাদি ছাই এরই উপযুক্ত ব্যাবহার বাংলাদেশে হচ্ছে না।

শব্দ দূষণ: কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন, জেনারেটর, কম্প্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, কয়লা উঠানো নামানো, পরিবহন ইত্যাদির কাজে ব্যাবহ্রত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন থেকে ভয়াবহ শব্দ দূষণ হয়। সুন্দরবন এলাকায় রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের বেধে দেয়া মাত্রার (দিনের বেলা ৫০ ডেসিবল, রাতে ৪০ ডেসিবল) চেয়ে বেশি শব্দ তৈরী হবে বলে ইআইএতে স্বীকার করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকার উচ্চ শব্দর বাইরে কয়লা পরিবহন, ওঠানো নামানো, ড্রেজিং, স্থল ও নদীপথে বাড়তি যান চলাচল ইত্যাদির কারণে যে শব্দ দূষণ হবে তার ফলাফল সুন্দরবন ও আশপাশের পরিবেশের উপর কি হবে!

স্বাস্থ্যগত ঝুকি: কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত সালফার, নাইট্রোজেন, কার্বন ইত্যাদির বিভিন্ন যৌগ কিংবা পারদ, সীসা, ক্যাডমিয়াম, ব্যারিয়াম ইত্যাদি ভারী ধাতুর দূষণ ছাড়াও কুলিং টাওয়ারে ব্যাকটেরিয়া সংক্রামণের কারণেও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আকারে নিউমোনিয়া জাতীয় রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

ইআইএ রিপোর্টে এসম্পর্কে বলা হয়েছে: সুন্দর বনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনের ফলাফল রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আমদানীকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই পরিবহন করা হবে! এ জন্য সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রায় সারা বছর ধরে হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করে গোটা সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলবে। সরকারি পরিবেশ সমীক্ষা ইআইএ অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সমুদ্র পথে আমদানী করতে হবে। আমাদানীকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে মংলা বন্দরে এনে তারপর সেখান থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য সুন্দর বনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ কিমি নদী পথে বড় জাহাজ বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত প্রয় ৬৭ কিমি পথ ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহন করতে হবে!। সরকারের পরিবেশ সমীক্ষাতেই স্বীকার করা হয়েছে, এভাবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করার ফলে। পরিবহনকারী জাহাজ থেকে গুড়া, ভাঙা /টুকরো কয়লা, তেল, ময়লা আবর্জনা, জাহাজের দূষিত পানি সহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নি:সৃত হয়ে নদী-খাল-মাটি সহ গোটা সুন্দরবন দূষিত করে ফেলবে। এবং চলাচলকারী জাহাজের ঢেউয়ে দুইপাশের তীরের ভূমি ক্ষয় হবে। কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ও কয়লা লোড-আনলোড করার যন্ত্রপাতি থেকে দিনরাত ব্যাপক শব্দ দূষণ হবে। রাতে জাহাজ চলা-চলের সময় সার্চ লাইটের আলো নিশাচর প্রাণী সহ সংরতি বনাঞ্চল সুন্দরবনের পশু-পাখির জীবনচক্রের উপর মারাত্বক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

ইআইএ রিপোর্টে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নির্মাণ, পরিচালানা ও কয়লা পরিবহনের ফলে সুন্দরবনের উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে এমন সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে যা প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পকে পরিবেশগত বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করার জন্য যথেষ্ট।

বস্তুত, এর চেয়ে আরো সামান্য কারণে খোদ এনটিপিসিরই ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত অনুমোদন দেয় নি ভারতের কেন্দ্রীয় গ্রীণ প্যানেল। অথচ বাংলাদেশে সেই এনটিপিসিকে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে সুন্দরবনের মতো সংরতি একটি বনাঞ্চল, কৃষি জমি, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবগুলো তোয়াক্কা না করেই।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল¬াহ আবু সাইয়ীদ বলেন, যে কোনো কিছু করতে গেলে তার খারাপ দিক থাকে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে প্রথম থেকেই বিতর্ক উঠেছে। সবকিছু পলিটিক্যালি বা টেকনিক্যালি না দেখে জনগণের কথাও ভাবা উচিত।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল আলম বলেন, ইআইএ রিপোট্রের ভিত্তিতে সেখানে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাগেরহাট প্রেসক্লাবে ‘মিট দ্যা প্রেস’ অনুষ্ঠানে নিজের তৈরী একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপি¬নের অধ্যাপক ড. আব্দুল¬াহ হারুন চৌধুরী বলেন। ‘রামপালের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে অত্র এলাকা এবং সুন্দরবনের ওপর পরিবেশগত প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের রামপালে এ ধরণের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে পরবর্তি কুড়ি বছরের মধ্যে এলাকার পানি, বাতাস ও মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Use Facebook to Comment on this Post

Leave a Reply

Editor : ISHARAT ALI, 01712651840, 01835017232 E-mail : satkhiranews24@yahoo.com, rangtuli80@yahoo.com


Site Hosted By: WWW.LOCALiT.COM.BD