23 September 2017 , Saturday
Bangla Font Download
সর্বশেষ খবর »

You Are Here: Home » কলাম, শিক্ষাঙ্গন » আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন পথে?

sa news
– বিনীত কুমার জোয়ারদার :

অতি সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল বা কলেজ বিমুখতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুল-কলেজে না যাওয়াটা আজ-কাল ফ্যাশানে পরিনত হয়েছে। যেটা শিক্ষা সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে ভাবাচ্ছে। কিন্তু কেন এই প্রতিষ্ঠান বিমুখতা? কলেজে না যাওয়ার যে প্রবনতা- সেটা স্কুল পর্যায়ে আজকাল আরও বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ মুলতঃ কোচিং এবং প্রাইভেট। স্কুল কলেজে ক্লাস করার পরিবর্তে গুরুগৃহে শিক্ষা গ্রহণের ফলে স্কুল কলেজে যাওয়ার প্রবনতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যেটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য হুমকী স্বরূপ। তবে এই প্রবনতা একদিনে শুরু হয়নি। কিছুদিন আগেও দেখতাম শিক্ষার্থীরা কলেজে প্রথম বা দ্বিতীয় ক্লাসটা কোন মতে করতো, এরপর কলেজ ফাঁকা। কারণ তারা খুব ভোরে- কিছু না খেয়ে কিংবা হালকা নাস্তা সেরে প্রাইভেটে বা কোচিং-এ যেতো। এরপর কলেজে দু-একটা ক্লাস কোন মতে করতো। এরপর ক্ষিধের জ্বালায় কলেজ ত্যাগ। ইদানিং এই নিয়মটাও বদলে গেছে। ওরা ভোর রাতে বেরোয় কোচিং ক্লাসের জন্য। প্রথমে ইংলিশ এরপর পর্যায়ক্রমে হিসাব বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়ণ, গণিত, বাংলা A-Z স্যারদের বাসায় পড়তে পড়তে কলেজ টাইম পার। স্কুল কলেজ শুধূ ভর্তির, ফরম পুরণের আর পরীক্ষার জন্য দরকার বাদ বাকিটা অমুক স্যার, তমুক স্যার। এই হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার হালচাল। উপজেলা সদরের স্কুল কলেজ গুলোর এই হচ্ছে অবস্থা। গ্রামের স্কুল কলেজের অবস্থা- একটু ভাল হতেও পারে। তবে যুগের হাওয়া না লেগে যায় না। আর সারা দেশের অবস্থা যদি এই হয় তাহলে এদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ খুবই দুর্ভাগ্যজনক আর এই দুর্ভাগ্যকে আরও বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছে ‘গাইড’। কতশত গাইড বৈতরনী শিক্ষার্থীর ভবনদীতে পারানীর কড়ি নিয়ে তরী ডুবাচ্ছে কে জানে! শিক্ষার্থীরা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে উভোগেলা করছে; না হচ্ছে হজম- না যাচ্ছে ফেলা। সুতরাং পুনরায় প্রাইভেট স্যার।
প্রাইভেট আর গাইড যেন একে অপরের পরিপুরক। যেন ফটকা বাজারের সিন্ডিকেট। কিন্তু এই পরস্পর আঁতাত করা দুটি অনুষঙ্গের মধ্যে সম্পর্কটা কি সাংঘর্ষিক নয়? কে তার জবাব দেবে। একটু সোজা কথায় ভাবা যাক- গাইড যদি পরীক্ষায় সাফল্যের শতভাগ নিশ্চয়তার দাবীদার তাহলে কোচিং, প্রাইভেট, টিউশন কি দরকার। আর কোচিং বা প্রাইভেট যদি শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় তবে গাইড কেন? তাহলে প্রশ্ন হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন পথে এগুচ্ছে?
কথায় বলে, ‘জলই জীবন’ কিন্তু প্রকৃত কথা হল, বিশুদ্ধ জলই জীবন, কেননা যে জল জীবন দায়ী সেই জল বিশুদ্ধ না হলে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তেমনি, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’- কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা ছাড়া জাতি মেরুদন্ডহীন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- শিক্ষার প্রসার নিয়ে চারিদিকে যখন রমরমা তখন শিক্ষা নিয়ে এত শঙ্কা কেন? তাহলে কি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সত্যিই ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে? বাইরের জৌলুসে আমাদের শিক্ষা কাঠামো ধাঁ-চক-চক কিন্তু ভিতরটা বড্ড- ফাঁপা, ফাঁকা একেবারে। হাসান আজিজুল হক স্যারতো বলেছেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মুমূর্ষূ নয় মৃত। তাহলে তো বিষয়টা ভাবনার; কিন্তু ভাবার দায়িত্বটা কার? কে ভাববে? আমরা সবাইতো গতানুগতিকতার হাওয়ায় ভাসছি। কিন্তু এভাবে নির্ভাবনায় বসে বসে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কোন মেরুদন্ডহীন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছি! ভাবনাটা যদি সত্যিই দুর্ভাবনার হয় তাহলে আজই, ঠিক এখনই সজাগ হতে হবে।
প্রথমে যে ভাবনাটা ভাবনার তাহল, যে শিক্ষা জাতিকে সম্ভাবনার আলো দেখায়- সেই শিক্ষাই যদি সংকটে আবর্তিত হয় তাহলে তো অচিরে সে জাতি তিমির অতলে নিমজ্জিত হবে। প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সেরকম সংকটকাল অতিক্রম করছে কিনা! নিঃসন্দেহে সংকটে; তবে অতিক্রম করতে পারছেনা, ব্যর্থ হচ্ছে। তাহলে এই ক্রান্তিকাল থেকে নিস্ক্রমনের উপায় কি? উপায় খোঁজার আগে আমাদের খুঁজতে হবে সংকটগুলো কি?
প্রিয় পাঠক আপনি কি আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদৌ চিন্তিত নন? তাহলে ভাবছেন না কেন? কেন ভাবছেনা শিক্ষার্থী মহল? শিক্ষক সমাজ কেন নির্বিকার? সুশীল সমাজ ভাবনা হীন কেন? বর্তমান প্রজন্মকে শিক্ষায় বাণিজ্যিকিকরণের বলিকাঠে তুলে দিলে জাতি যে মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়বে। নীতি নির্ধারনী মহল কি যুগের হাওয়ায় গা-ভাসিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন?
অবশ্য শিক্ষাকে ধ্বংস করার যে দুটি বিষয় নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন সেই কোচিং/প্রাইভেট এবং গাইডবিষয় দুটি নিয়ে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় সময়োচিত উদ্যোগ নিয়েছিলেন? প্রাইভেট বা কোচিং বাণিজ্য সংকুচিতকরণ এবং গাইড বর্জন। কিন্তু সেই শুভ উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর না হওয়া বরং কোচিং ও গাইড ব্যবস্থা প্রসারিত হওয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের যে শিক্ষার্থী কোচিং এবং গাইড ছাড়া পরীক্ষায় পাশের কথা ভাবতেই পারছে না তাকেও ভাবার জন্য বলবো, আজ থেকে বছর বিশেক বা পঁচিশেক আগে সেই অর্থে বাজারে কোন গাইড পাওয়া গেত না, কোচিং ও সেভাবে অঙ্কুরিত হয়নি। তাবলে আমরা কি পরীক্ষায় পাশ করিনি? বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স বা মাষ্টার্স- এর পরীক্ষার জন্য যে কোন গাইড পাওয়া যায় এটা আমরা ভাবতেও পারিনি কোনদিন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ কি পাশ করতো না। অন্যদিকে একজন প্রাইভেট স্যার তাঁর বাসগৃহে বা কোচিং সেন্টারে যে পাঠদান করেন, সেই পাঠদান স্কুলে বা কলেজে শ্রেণি কক্ষে দেওয়া কেন সম্ভব নয়। যেন হসপিটাল ছেড়ে রুগিকে ক্লিনিকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু কেন?
ভাবতে ভাল লাগে, বিস্মিত হতে হয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি তখন লাইব্রেরী ওয়ার্ক করে নোট তৈরী করেছি; নিদেন পক্ষে সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে হ্যান্ড নোট সহযোগিতা নিয়েছি। বাজারে কোন গাইড তখন পাওয়া যেত না, আর গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয় যে বিষয়টি, তাহল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন স্যারকে কোনদিন প্রাইভেট পড়াতে দেখিনি এমনকি শুনিনি। তবে আজ আমাদের শিক্ষক সমাজের এই প্রাইভেট প্রবনতা কেন? গভীর থেকে বিষয়টি তলিয়ে দেখতে হবে?
বিশেষ করে বেসরকারী স্কুল কলেজের বেতন ভাতার বিষয়টি খুবই লজ্জাকর ও দুঃখজনক- যেটা প্রাইভেট প্রবনতার একটা বিশেষ কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। শিক্ষকরা বছরে দুইটি উৎসব ভাতার ২৫শতাংশ হারে বোনাস পায়। অন্য যে কোন সরকারী, আধা সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারী দুটি পরিপূর্ণ বোনাস উত্তোলন করেন। মেরুদন্ড রক্ষার কারিগরের উপর একি বিমাতৃসুলভ বিবেচনা। ঈদের লক্ষ টাকার গরুকি শিক্ষকদের জন্য পঁচিশ হাজার টাকায় পাওয়া যায়? তাহলে কেন এ বৈষম্য! শিক্ষকের বোনাস নেই, ইনক্রিমেন্ট নেই, বাড়ী ভাড়াও লজ্জাজনক। যে পেশা মর্যাদার, তা অবহেলায় ফেলে রাখলে জাতি হিসেবে আমরা কোন দিন জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন পাব না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘পশ্চাতে ফেলিছ যারে, সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’।
শিক্ষা ব্যবস্থার এ বেহাল অবস্থা অচিরে দূর করতে না পারলে জাতি নিকট ভবিষ্যতে তার মেরুদন্ডকে হারাবে সন্দেহাতীতভাবে। আর তাই অবিলম্বে আমাদের কিছু কিছু কার্যকরী ভূমিকা নেওয়া ছাড়া অন্য পথ নেই।
কোচিং ও গাইড ব্যবস্থাকে কঠোর আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে।
আর এই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে সচেতন সুশিল সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
যে শিক্ষক মন্ডলী স্কুল-কলেজে চাকুরী করে প্রজাতন্ত্রের বেতন ভাতা গ্রহণ করবেন তারা প্রাইভেট বা কোচিং পড়াতে পারবেন না।
স্কুল বা কলেজের অভ্যন্তরিণ চুড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ৫০-৬০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামুলক করতে হবে এবং উপস্থিতির জন্য প্রত্যেক বিষয়ে ন্যুনতম একটা নম্বর বরাদ্দ থাকতে হবে। পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পুরণের ক্ষেত্রে কলেজিয়েট এবং নন কলেজিয়েট বিষয়টি কঠোরভাবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের বেতন ভাতা প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সমকক্ষ হতে হবে। এরকম কিছূ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বসকে কিছুটা প্রশমন ঘটাতে পারবো বলে আশা করি।

লেখক-প্রাবন্ধিক, গবেষক (সহকারী অধ্যাপক আতরজান মহিলা মহাবিদ্যালয় শ্যামনগর, সাতক্ষীরা)
মোবাঃ ০১৭১৫-৬০৯৫১৫ তারিখঃ ২৯/১১/২০১৪ ইং

Use Facebook to Comment on this Post

Leave a Reply

Editor : ISHARAT ALI, 01712651840, 01835017232 E-mail : satkhiranews24@yahoo.com, rangtuli80@yahoo.com


Site Hosted By: WWW.LOCALiT.COM.BD